নারীর রাষ্ট্রীয় প্রধান হওয়া নিষেধ –

রাসূল (সা) যখন অবগত হলেন যে, ইরানের জনগণ কিসরার কন্যাকে তাদের নেত্রী নির্বাচন করেছে। তখন তিনি বললেন, ‘ঐ জাতি কখনও সফলকাম হতে পারে না, যারা নারীকে তাদের নেত্রী নির্বাচিত করে’ (বুখারী)।

তাহলে যারা দাবি করেন অমুক নেত্রী দ্বারা দেশের ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে বা হবে। সে রসুলের (সা) হাদীসকে অবিশ্বাস করলো। ১৪০০ বছরে মুসলিমদের মাঝে এই নিয়ে দ্বিমত ছিল না।

খিলাফাহ রাশেদীন, বনু উমাইয়া, বনু আব্বাস, সেলজুক, মামলুক, আইউবি, উসমানী, মুঘলগণ কেউই নারীকে খলিফা বা রানী করেননি। কিন্তু বর্তমানে এগুলো নিয়ে মানুষের মধ্যে ফিতনা সৃষ্টি করছে একদল লোক। তারা আয়েশাকে (রা:) জঙ্গে জামালের প্রসঙ্গ এনে ভুল ব্যাখা করে। এদের কারণে শিয়ারা অপবাদ দেওয়ার সুযোগ পায়। অথচ আয়েশা (রা:) খলিফা ছিলেন না বা দাবী করেননি। না তিনি সেনাপ্রধান ছিলেন। না তিনি বর্তমান তাগুতের মত মানবরচিত আইনের প্রতিনিধিত্ব করতে চেয়েছেন, নাউজুবিল্লাহ। সুতরাং এই তুলনাই অযৌক্তিক।

ইসলামী রাষ্ট্রে সবচেয়ে উত্তম পুরুষই খলিফা, আমীর ও গভর্নর হয়। তিনি শুধু রাষ্ট্রের ঈমাম নন বরং সালাতেরও ঈমাম হন। আর নারীরা সালাতে ঈমামতি করতে পারে না। আর প্রয়োজনে খলিফাকে জিহাদের নেতৃত্ব দিতে হয়।

আলী (রা), হাসান (রা), আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রা) খলিফা থাকা অবস্থায় সমকালীন জিহাদের নেতৃত্ব দেন। যা একজন নারীর জন্য কষ্টকর। কিন্তু একজন নারী মুজাহিদ সন্তান তৈরি করতে পারেন, মুজাহিদ ভাই, পিতার সাহায্যকারী হতে পারেন। আসমা (রা:) তৈরি করেছিলেন সেই যুগের শ্রেষ্ঠ সন্তান আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রা:) কে।

আর নবীদের মা, স্ত্রীও নারী ছিলেন। ইসলামে যাদের ভূমিকা ছিল অতি গুরুত্বপূর্ণ। আর খলিফাকে প্রয়োজনে রাষ্ট্রীয় সফর ও চুক্তি করতে হয়। উমর (রা:) শাম বিজয়ের পর সফর করতে হয়েছিল, খ্রিস্টানদের সাথে আলোচনা হয়। কিন্তু একজন নারী ইলমধারী হলে বিভিন্ন মাসয়ালা জানিয়ে সাহায্য করতে পারেন। যেমন- রসুলের (সা:) জীবনসঙ্গিনীরুপে আয়েশা (রা:) কে স্বয়ং আল্লাহ পছন্দ করেছেন। যিনি অল্প বয়সে কুরআন মুখস্থ করেছেন, সর্বাধিক হাদীস বর্ননাকারীদের একজন যার স্মৃতিশক্তি, হিকমাহতে বহু সাহাবী লাভবান হন।

আবু মুসা আশয়ারী (রা) বলেন- যখন আমরা সাহাবীরা কোন হাদিস বুঝতে অক্ষম হতাম তখন হযরত আয়েশা (রা.) এর খেদমতে উপস্থিত হলে তিনি তাঁর অতুলনীয় জ্ঞানের মাধ্যমে মাসআলা বুঝিয়ে দিতেন।

ওরয়াহ (রাঃ) বলেন- আমি হযরত আয়েশা (রা.) এর চেয়ে বড় চিকিৎসা শাস্ত্র সম্পর্কে জ্ঞানী কাউকে দেখিনি।

তিনি আরাে বলেন- কোরআনে হাকীম, ফারায়েজ, হালাল-হারাম, কবিতা, ইতিহাস এবং নসবনামা সম্পর্কে হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বড় জ্ঞানী কাউকে দেখিনি।

একজন নারীর জন্য পর্দা ফরজ। আর পর্দা বজায় রেখে রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব নয়। আর যারা আয়েশা (রা:) এর নেতৃত্বের ক্ষেত্রে জঙ্গে জামালের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন। অথচ উম্মত সরাসরি আয়েশার (রা:) এর বিরুদ্ধে তালোয়ার ধরেছেন কি? না আয়েশা (রা) তীর ধনুক চালিয়েছেন? বরং খারেজীরা ফিতনা তৈরি হবার অন্যতম কারণ ছিল- আয়েশাকে (রা:) বন্দী কেন করা হলো না?

আলী (রা), ও সাহাবীরা সম্মানের সহিত আয়েশার (রা) মর্যাদা রক্ষার ব্যবস্থা করেন। উসমানের (রা:) হত্যাকে কেন্দ্র করে ফিতনা সৃষ্টি হয়। যা পরবর্তীতে যুদ্ধে পরিণত হয়। মূল ব্যাপার ছিল আয়েশাও (রা:) যুদ্ধে আগ্রহী ছিলেন না বরং তাকে দেখলে শান্তি ফিরে আসতে পারে এজন্য তিনি অনিচ্ছা স্বত্বেও অবস্থান নেন।

কায়েস বর্ণনা করেন, উম্মুল মুমিনীন ‘আইশাহ যখন তার বাহিনী নিয়ে বনু আমিরের জলাশয়ের নিকট পৌঁছালেন, তখন কুকুর ঘেউ ঘেউ করা শুরু করল। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, এই জলাশয়ের নাম কী? তারা উত্তরে বললেন: ‘হাওয়ার জলাশয়’।

একথা শুনে তিনি বললেন: তাহলে আমাকে অবশ্যই ফিরে যেতে হবে। তার সঙ্গীগণের কেউ এই সিদ্ধান্তে পরামর্শ দিলেন: না, বরং আমাদের সামনে এগিয়ে যাওয়া দরকার। হয়তোবা মুসলিমগণ আপনাকে দেখার পর মহান আল্লাহ তাদের মধ্যে শান্তির ব্যবস্থা করে দেবেন।

উম্মুল মুমিনীন ‘আইশাহ বলেন; আল্লাহর নবী একবার আমাকে বলেছিলেন, “তোমাদের মধ্যে একজনের অবস্থা কেমন হবে যখন হাওয়ার এর কুকুর তার দিকে ঘেউঘেউ করা শুরু করবে।” [মুসনাদ আহমাদ ২৪২৯৯ ( ৬ষ্ঠ খন্ড, পৃষ্ঠা ৫২, সিলসিলা সহীহাহ ৪৭৪ )।

উসমান (রাঃ) এর হত্যাকারীর সন্দেহের তালিকায় অন্যতম প্রধান ছিলেন মুহাম্মদ বিন আবু বকর (রহঃ)। মাতা ভিন্ন হলেও পিতার দিক হতে আয়েশা (রা) এর আপন ভাই। তার মাতার নাম আসমা বিনতে উনাইস। আবু বকর (রাঃ) এর মৃত্যুর পর আলী (রাঃ) তাকে বিয়ে করেন এবং মুহাম্মদ ইবনে আবু বকর (রাঃ) তার গৃহে বড় হয়।

ইতিহাস হতে যতটুকু জানা যায় – উসমানের (রাঃ) হত্যার দিন তিনিও উসমানের (রাঃ) গৃহে প্রবেশ করেন। কিন্তু যখন উসমান (রাঃ) তাকে স্মরণ করিয়ে দিলেন আবু বকর (রাঃ) উসমানকে (রাঃ) কিরূপ ভালোবাসতো তা শুনে তিনি গৃহ ত্যাগ করেন। কিন্তু ঘটনা ছড়িয়ে যায় – তিনি হত্যাকান্ডে শামিল হয়েছিলেন। তাই আয়েশা (রাঃ) তার ভাইয়ের বিরুদ্ধে যেতে দ্বিধা করেননি। পক্ষান্তরে মুহাম্মদ বিন আবু বকর (রাঃ) ছিলেন আলী (রাঃ) এর অন্যতম সেনাপতি। তারা জানতেন আলী (রাঃ) হক্বের পথে। জঙ্গে জামাল শেষে আলী (রাঃ) তাকেই দায়িত্ব দেন আয়েশাকে (রাঃ) সস্মানের সহিত পৌছিয়ে দিতে।

শিয়ারা আবু বকর (রাঃ) সহ অনেককে কাফির বলে। অথচ আবু বকরের (রাঃ) ছেলে মুহাম্মদ বিন আবু বকর (রহঃ), তার ছেলে কাসিম (রহঃ) এবং কাসিমের (রহঃ) মেয়ে ফাতেমা, যিনি ছিলেন শিয়াদের সবচেয়ে বড় ঈমাম জাফর সাদিকের (রহঃ) মা। এই হতে বুঝা যায় প্রথম দিকে শিয়ারা আবু বকর (রাঃ), উমর (রাঃ) এর প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শন করত। আর উমরের (রা:) বিয়ে হয় আলী (রা:) এর মেয়ে উম্মু কুলসুমের সাথে।।

পরবর্তী জীবনে আয়েশার (রা:) আলীর (রা:) প্রতি ভালোবাসা ও সম্মানের প্রমান পাওয়া যায় হাদীস হতে। বরং তিনি অনুশোচনারত থাকেন আর তিনি অসিয়ত করেন-

আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি আবদুল্লাহ্ ইবনু যুবাইর (রাঃ)-কে অসিয়াত করেছিলেন, আমাকে তাঁদের (নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও তাঁর দু’সাহাবী) পাশে দাফন করবে না। বরং আমাকে আমার সঙ্গিনীদের সাথে বাকী’তে দাফন করবে যাতে আমি চিরকালের জন্য প্রশংসিত হতে না থাকি।

হিকমাহ দেখুন- তার কবর যদি রসুলের (সা:) সাথে হতো একে (মর্যাদা নিয়ে বাড়াবাড়ি) কেন্দ্র করে হয়তো ফেতনাবাজরা আলী (রা:) ও ফাতেমার (রা:) মুকাবেলায় দাড় করাত। কারন তাদের কবর রসুলের (সা:) নিকট হয়নি।

প্রকৃতপক্ষে তিনি ছিলেন অন্যায়ের প্রতিবাদী, নির্ভীক। অন্যায় মনে করে যিনি আলী (রা:) ও নিজের ভাই মুহাম্মদ বিন আবু বকরের (রা:) বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে মুহাম্মদ বিন আবু বকরের (রা:) উপর আঘাত আসলে (হত্যা হলে) তিনিই তীব্র প্রতিবাদ করেন।

হারূন ইবনু সাঈদ আইলী (রহঃ) ….. ‘আবদুর রহমান ইবনু শুমাসাহ্‌ (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি একদা আয়িশাহ্ (রাযিঃ) এর নিকট কোন এক ব্যাপারে প্রশ্ন করার জন্য গেলাম। তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কোথাকার লোক? আমি জবাব দিলাম, আমি একজন মিসরবাসী।

তখন তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন তোমাদের সে গৃহযুদ্ধকালীন গভর্নর (মুহাম্মাদ ইবনু আবূ বাকর) কেমন লোক ছিলেন? রাবী বলেন, আমরা তো তার নিকট থেকে অন্যায়মূলক কিছু পাইনি। যদি আমাদের কোন ব্যক্তির উট মারা যেতো তিনি তাকে উট দিতেন। গোলাম মারা গেলে গোলাম দিতেন, কারো জীবিকার প্রয়োজন হলে তিনি তাকে তা প্রদান করতেন।

তখন তিনি বললেন, আমার সহোদর মুহাম্মাদ ইবনু আবূ বকরের সাথে যে দুর্ব্যবহার করা হয়েছে, তা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে আমার এ ঘরে যা বলতে শুনেছি তা তোমাকে অবহিত করা থেকে আমাকে বিরত রাখতে পারছি না। (তিনি বলেছিলেন) হে আল্লাহ! যে আমার উম্মাতের কোনরূপ কর্তৃত্বভার লাভ করে এবং তাদের প্রতি রূঢ় আচরণ করে তুমি তার প্রতি রূঢ় হও, আর যে আমার উম্মাতের উপর কোনরূপ কর্তৃত্ব লাভ করে তাদের প্রতি নম্র আচরণ করে তুমি তার প্রতি নম্র ও সদয় হও। (সহীহ মুসলিম-ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪৫৭১, ইসলামিক সেন্টার ৪৫৭৪, হাদিসের মানঃ সহিহ।)

বনু উমাইয়ার ক্ষমতার সময় মুহাম্মদ বিন আবু বকর (রা:) খুন হন।