কাফির, জালিমরা ক্ষমতা পেলে মুসলিমের উপর জুলুম হয়। ফলে মুসলিমরা ইসলামে ফিরে আসে, প্রতিবাদ বা প্রতিকার করার প্রচেষ্টা চালায়। অপরদিকে মুনাফিকরা ক্ষমতা পেলে টিকিয়ে রাখতে বা ক্ষমতা পাবার জন্য ইসলামকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে। বহু কুফর, বিদআতকে ইসলামী অভিহিত করে জায়িজ করতে চায়। এজন্য তারা রসুল (সা:), সাহাবীদের নামে অপবাদ দিতেও দ্বিধাবোধ করে না।
আহমাদ ইবন মানী’ (রহঃ) ….. সাফীনা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমার উম্মতের খিলাফত হবে ত্রিশ বছর। এরপর হবে বাদশাহী। সহীহ, সহিহাহ ৪৫৯
নু’মান বিন বশীর (র) আল্লাহর নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর গোপন বিষয়ের জ্ঞানধারণকারী হুযাইফা (র) হতে বর্ণনা করেন, আমি আল্লাহর নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হতে শাসকদের সম্পর্কে হাদিস মুখস্থ রেখেছি। তিনি বলেন: “নবুওয়্যাত তোমাদের মাঝে থাকবে, যতদিন মহান আল্লাহ চান, এরপর তিনি তা উঠিয়ে নেবেন যখন তিনি চান। অতপর, নবুওয়্যাতের আদলে খিলাফাহ আসবে এবং তা বিদ্যমান থাকবে যতদিন তিনি চান এবং তিনি উঠিয়ে নেবেন যখন তিনি চান।
অত:পর আসবে উত্তরাধিকার সূত্রে রাজতন্ত্র এবং তা থাকবে যতদিন মহান আল্লাহ চান এবং তিনি তা উঠিয়ে নেবেন যখন চান। অতঃপর আসবে চরম জবরদস্তির শাসন, যা থাকবে যতদিন মহান আল্লাহ চান এবং যখন তিনি চান, তা উঠিয়ে নেবেন। অতঃপর আসবে নবুওয়্যাতের আদলে খিলাফাহ। এর পর তিনি চুপ হয়ে গেলেন। (মুসনাদে আহমাদ ১৮৪৩০, ৪র্থ খন্ড,পৃষ্ঠা-২৭৩)
খেলাফায়ে রাশেদীনের যুগের পর হতে উম্মাহর বুকে চেপে আসে রাজতন্ত্র, তার মধ্যে কিছু ভালো শাসক ছিল (আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রা, উমর ইবনে আবদুল আজিজ রহ)। ইসলামের অনেক অগ্রগতি হয়েছিল – কিন্তু শাসকরা নিজেদের ক্ষমতা বাচাতে মুসলিমদের হত্যা করেছিল।
খেলাফায়ে রাশেদীনের পর হতে নিজেদের সুবিধার্থে ইসলামের ফেরকার অনুপ্রবেশে বাধা না দিয়ে বরং সহায়তা করেছিল যেন দরবারী আলেমদের দিয়ে তাদের রাজতন্ত্র টিকিয়ে রাখা যায়। যেমন – উমাইয়াদের সময় জাবারিয়া ফেতনার প্রসার পায় – এদের দ্বারা বিরোধিতাকারীর হত্যার সর্মথন দেওয়া হতো। তাদের শাসনামলে আহলে বায়াত ও আব্বাসীদের উপর হত্যাকান্ড, নির্যাতন চলে।
কারবালা ও আহলে বায়াতের মহব্বতের নামে আব্বাসীরা ক্ষমতায় আসে, এবং বনু উমাইয়াদের নিরীহদের উপরও জুলুম চালায় কিন্তু আহলে বায়াত প্রাপ্য সম্মান পায়নি। আব্বাসীদের অনেকে নিজেদের সুবিধার্থে কাদেরিয়া মতবাদের সমর্থন ও প্রসার করে প্রথমে। আবার উসমানী সাম্রাজ্য, মুঘল সাম্রাজ্যে অনেক বিদআতের প্রসার ঘটে।
অনেকে এসব আলোচনা করলে আমাদের ফিতনাবাজ, ইসলামের ভুল ব্যাখাকারী উপাধি দেন। অথচ তারা যাদের হক্বপন্থী ঈমাম মানেন তারা– ঈমাম আবু হানিফা (রহ:) ও ঈমাম মালেক (রহ:) রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে গিয়ে আহলে বায়াতের পক্ষ নেন। মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহর (নফসে জাকিয়া, যিনি হাসান (রা:) বংশধর) পক্ষ নিয়ে রাজতন্ত্রের বিপক্ষে গিয়ে আর্থিক সাহায্য ও বায়াআত করার কারনে ঈমামদের উপর জুলুম নির্যাতন হয়। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া)
বর্তমান দাখিল মাদ্রাসার বইয়ে (১১৬-১১৭ পৃষ্ঠায়) ফিতনাবাজরা উল্লেখ করেছে- গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ছিল নাকি উমর (রা:) এর শাসন ব্যবস্থার মূল বৈশিষ্ট্য। মজলিশে শুরা ও গনতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা একই রকম তুলনা করার প্রচেষ্টা করেছে।
ইসলাম কখনো গণতান্ত্রিক ক্ষমতা, প্রার্থী মনোনয়নের অপরাজনীতি ছিল না। মজলিশে শুরা খলিফা নির্বাচিত করতো। কেউ খলিফা হওয়ার জন্য জনগণের নিকট নিজের প্রশংসা ও অন্য খলিফা প্রার্থীর নামে নিন্দা, সমালোচনা করতো না।
খেলাফায়ে রাশেদিনের ইসলামী রাষ্ট্রে বিরোধী দল বলে কিছু ছিল না। প্রতিটি ব্যক্তি খলিফা, গভর্নরদের ভুল সংশোধন করিয়ে দেওয়ার অধিকার রাখতো। তারা ভুল ধরিয়ে দিতেন তাতে খলিফা, গভর্নর খুশি হতো কারণ ভুল সংশোধনের মাধ্যমে খলিফা/জনগণ ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষতি হতে রক্ষা পেত।
শাসকের তোষামোদী করাকে অপছন্দনীয় ভাবা হতো। আর এখন শাসক, নেতার তোষামোদী করলে পদ, অর্থ, মর্যাদা মিলে। সকল দলের বড় নেতারা নিজ দলের ছোট নেতাদের সত্য সমালোচনা সহ্য করতে পারে না। তার উপর সন্তুষ্ট না হয়ে পদচ্যূত করে। যারা নিজেদের সংশোধন করতে চায় না তারা দেশ ও জাতির সংশোধন করবে আশা করা বোকামি।
ইসলামী রাষ্ট্রে ইসলামের গন্ডির ভেতর মত প্রকাশের অধিকার ছিল। বর্তমান মত প্রকাশের অধিকারের নামে ইসলামের নিয়মনীতি নিয়ে সমালোচনার অধিকার ছিল না। তাই গণতন্ত্রের সাথে ইসলামী মত প্রকাশের অধিকার তুলনা করা অযৌক্তিক।
আরেকটি মিথ্যাচার হলো উমর (রা:) আরব জাতীয়তাবাদ অক্ষুণ্ণ রাখেন। উমর (রা:) নাকি ঘোষণা করেন আরব উপদ্বীপ শুধুমাত্র আরববাসীদের জন্য সুরক্ষিত থাকবে নাউজুবিল্লাহ। অথচ ইসলামে জাতীয়বাদ কুফর।
সালমান ফারসী (রা:), সুহাইল আর রুমী (রা;), দাহইয়া ইবনে কাল্ববিয়া (রা:) সহ বহু সাহাবী মক্কা-মদীনায় ছিলেন যারা আরবের অধিবাসী ছিলেন না। বরং ইসলামে সম্পর্কের ভিত্তি হয় তাওহীদের ভিত্তিতে।
“সকল ঈমানদারগণ পরস্পর ভাই ভাই।” (সুরা হুজুরাত- ১০)
আর আরবের মুশরিকদের শির্কের কারণে মক্কা-মদীনা হতে বের করে দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে আরব জাতীয়তাবাদ বা স্বজনপ্রীতি কোন কাজে আসেনি।
আবু ’উবাইদাহ্ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:
‘‘তোমরা আরব উপদ্বীপ থেকে নাজরান ও ’হিজায অধিবাসী ইহুদিদেরকে বের করে দাও এবং জেনে রাখো, সর্ব নিকৃষ্ট মানুষ হচ্ছে ওরা যারা নিজেদের নবীদের কবরকে মসজিদ বানিয়ে নিয়েছে’’।
আব্দুল্লাহ্ বিন্ ’আব্বাস্ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:
‘‘তোমরা আরব উপদ্বীপ থেকে মুশরিক তথা ইহুদি ও খ্রিস্টানদেরকে বের করে দাও। তবে তোমরা তাদের প্রতিনিধি দলকে প্রবেশের অনুমতি দিবে যেভাবে আমি তাদেরকে প্রবেশের অনুমতি দিতাম’’।
’উমর বিন্ খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:
‘‘আল্লাহ্ চায়তো আমি আরো কিছু দিন বেঁচে থাকলে ইহুদি ও খ্রিস্টানদেরকে আরব উপদ্বীপ থেকে অবশ্যই বের করে দেবো। যেন এতে মুসলমান ছাড়া আর কেউ না থাকে’’।
আল্লাহ বলেন- হে ঈমানদারগণ! মুশরিকরা তো অপবিত্র। সুতরাং এ বছরের পর তারা যেন মসজিদুল-হারামের নিকট না আসে। আর যদি তোমরা দারিদ্রের আশংকা কর, তবে আল্লাহ চাইলে নিজ করুনায় ভবিষ্যতে তোমাদের অভাবমুক্ত করে দেবেন। নিঃসন্দেহে আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময় (৯:২৮)।
(আহমদ, বুখারী, মুসলিম)
আল্লাহ তাআলা বলেন-
“হে ঈমানদারগণ, তোমার স্বীয় পিতা, ভাইকে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করো না, যদি তারা কুফরকে ঈমানের উপরে প্রাধান্য দেয়। তোমাদের মধ্যে যারা তাকে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করবে তারাই হবে জালেম।” (সুরা আত তওবা-২৩)
আমাদের পূর্ব পুরুষের সময়কালে অনেক ফিতনার সূচনা হয়। তখন অনেকে চুপ থাকায় ফিতনাগুলো ইসলামের নামে সমাজে ছড়িয়ে পড়ে। আজ গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক কুফরকে ইসলাম নামকরণ করে ক্ষমতা হাসিলের রাজনীতি চলছে। ভবিষ্যতে জাতি পথভ্রষ্ট হলে এর দায়ভার আমাদের উপরও বর্তাবে।
পৃষ্ঠাসহ প্রমান দেওয়া হলো –

